শিবচর উপজেলা প্রতিনিধি (মাদারীপুর)
বেকারত্ব নিরসন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সুবিধার এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মাদারীপুরের শিবচরের সম্ভাবনাময় তরুণ ও তরুণী উদ্যোক্তারা। তবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৮ বছর নির্ধারণ করায় এই সুবিধার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ৩০ বছরের বেশি বয়সী বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাঁদের জোরালো দাবি—উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের চেয়ে আগ্রহ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সম্ভাবনার দুয়ারে বয়সের বাধা
বেকারত্ব ঘোচাতে এবং নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণ কর্মসূচিটি একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই কর্মসূচিতে বয়সসীমা ২৮ বছর বেঁধে দেওয়ায় ৩০ বা তদূর্ধ্ব বয়সের আগ্রহী উদ্যোক্তারা হতাশায় পড়েছেন।
শিবচরের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ফয়সাল আহমেদ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “নিজের উদ্যোগে কিছু করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেক ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যক্তিগত সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করেও ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ আমাদের মতো নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার বড় দুয়ার খুলে দিতে পারে। কিন্তু ২৮ বছরের বেশি বয়সীদের আবেদনের সুযোগ না থাকলে অনেক আগ্রহী ব্যক্তি বঞ্চিত হবেন। তাই বয়সসীমা শিথিল করে ৩০ ঊর্ধ্বদেরও এ কর্মসূচির আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।
একই সুর শোনা গেল আরেক উদ্যোক্তা আবুল বাশারের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বয়সের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক ইচ্ছাশক্তি, যোগ্যতা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। কেউ ২৮ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করতে পারেন, আবার কেউ ৩৫ বছর বয়সে এসে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের পর উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আমার নিজেরও উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া গেলে ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতো।
মেহেরাব হোসেন নামে আরেক স্থানীয় যুবক মনে করেন, উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বয়সের কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত নয়। ভালো পরিকল্পনা ও কাজ করার আগ্রহ থাকার পরও শুধু পুঁজির অভাবে অনেকেই উদ্যোগ নিতে পারছেন না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থাকলেও বয়সের কারণে ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে এই কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে না। তাই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৩০ ঊর্ধ্বদের জন্যও ঋণের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি।
শিক্ষা জীবন শেষ করার পরপরই তরুণ বয়সে বড় ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগে নামার ক্ষেত্রে নানা রকম ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি আবুল খায়ের খান তাঁর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরে বলেন, “শিক্ষাজীবনেই কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলে তাঁকে নানা ধরনের সংকটে পড়তে হয়। একদিকে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপ, অন্যদিকে লেখাপড়ায় বিঘ্ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে অল্প বয়সে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি নেওয়া অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরও বলেন, “৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদেরও এ ধরনের অর্থায়ন সুবিধার আওতায় আনা হলে তাঁরা নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন। বেকারত্ব ও হতাশা থেকে অনেকে জীবিকার সন্ধানে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান। এমনকি অবৈধভাবে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাও করেন। দেশে সহজ শর্তে ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের প্রবণতা কমাতে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।” তাই অবিলম্বে উদ্যোক্তা ঋণের বয়সসীমা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে কেবল বয়সকে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। এর পরিবর্তে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে:
বাস্তবমুখী মূল্যায়ন: আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বাস্তবতা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
পৃথক কর্মসূচি: ৩০ ঊর্ধ্ব বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য আলাদা অর্থায়ন কর্মসূচি বা বিশেষ তহবিল চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা।
সহজ শর্ত ও মনিটরিং: ঋণ যেন প্রকৃত ও কর্মঠ উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায়, সেজন্য সহজ শর্তের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা রাখা।
বেকারত্ব নিরসন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকরা বিদ্যমান বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা শিবচরের ৩০ ঊর্ধ্ব বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীদের। বয়সসীমা শিথিল করে ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্যও ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অনেকেরই সুপ্ত উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। এর ফলে একদিকে যেমন আত্মকর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।