অনলাইন ২৫ জুলাই ২০২৬ জূলাই
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর ঘটে যাওয়া এই ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। ছয় মাস ধরে কোথাও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। অবশেষে তাকে পাওয়া গেলেও তখন আর প্রা/ণ ছিল না, ছিল শুধু ক/ঙ্কা/ল।
এটি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত একটি হ//ত্যা/কাণ্ড। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতা, তৎকালীন সাংবাদিকদের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং দেশজুড়ে আন্দোলনের ফলে শেষ পর্যন্ত এই রহস্যের জট খুলতে শুরু করে।
১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যান রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী নীহার বানু। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও তিনি আর বাড়ি ফেরেননি।
বিধবা মা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো কারণে দেরি হচ্ছে। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। মনে হচ্ছিল, বড় মেয়ে ফিরলেই হয়তো খোঁজ নেওয়া যাবে। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী শহীদ হওয়ার পর চিকিৎসক বড় মেয়েই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। মা, পাঁচ বোন ও এক ভাইকে নিয়ে চলছিল তাদের সংসার।
রাত বাড়তে থাকে, কিন্তু নীহার বানুর আর কোনো খোঁজ নেই। উৎকণ্ঠায় মা বারবার ঘরের দরজা খুলে বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরেন বড় মেয়ে। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা বলেন, “নীহার তো এখনো ভার্সিটি থেকে ফেরেনি।”
সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে বড় বোন ছোট ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন খোঁজে। শহরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করা শিক্ষার্থীদের বাসায়, সহপাঠীদের কাছে, অন্য বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের কাছে, পরিচিত শিক্ষকদের বাসায়, এমনকি থানা ও হাসপাতালেও খোঁজ করা হয়। কিন্তু কোথাও নীহার বানুর সন্ধান মেলে না।
শঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় কাটে পুরো রাত। পরিবারের সদস্যদের কাছে রাতটি যেন ১৯৭১ সালের সেই দুঃসহ রাতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, যেদিন পা/কি/স্তানি সে/নারা তাদের বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
পরদিন পরিবারের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নেন। বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। জানা যায়, নীহার বানু সেদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন এবং ক্লাসেও উপস্থিত ছিলেন। হাজিরা খাতায় তার উপস্থিতির প্রমাণও ছিল। কেউ জানান, ক্লাস শেষে প্রশাসনিক ভবনের পাশে এক সহপাঠী ছাত্রের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা গেছে। আবার কেউ বলেন, দুপুরের দিকে তাকে রিকশায় শহরের দিকে যেতে দেখা যায়। এটাই ছিল নীহার বানুকে শেষবার দেখার তথ্য।
এরপর তিনি আর কোনো দিন পরিবারে ফিরে আসেননি।
নীহার বানু নিখোঁজ হওয়ার পর তার সহপাঠী আহমেদ হোসেন বাবুকেও কয়েক দিন ক্যাম্পাসে দেখা যায়নি। বাবু তাকে একতরফাভাবে ভালোবাসতেন। তাই অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো তারা একসঙ্গেই কোথাও আছেন। কিন্তু নিখোঁজের তিন দিন পর বাবু আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন।
একই সময় বাবুর বন্ধু মিন্টুর আচরণও বদলে যায়। নীহার বানুর পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরিবারের সদস্যদের সামনে এলে তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন। তার এই পরিবর্তন পু/লিশের সন্দেহের কারণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পু/লিশের নজরে আসেন সেতু। তার হাতের কনুইয়ে একটি ক্ষ/ত ছিল। চিকিৎসককে তিনি বলেন, তাকে কু/কু/র কা/মড়েছে। কিন্তু ক্ষ/ত দেখে চিকিৎসকের সন্দেহ হয়, এটি কু/কু/রের নয়, মানুষের কা/মড়ের দাগ। নিজের সন্দেহ সেতুর কাছে প্রকাশ না করলেও তিনি বিষয়টি পু/লিশকে জানান।
পুলিশ সেতুকে আ/টক করে। পরে তার কাছ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেতুর স্বীকারোক্তিতে পুলিশ একটি বাড়িতে যায়। বাড়ির উঠোনের এক কোণে সি/মেন্ট দিয়ে পাকা করা একটি জায়গা দেখিয়ে দেন তিনি। জায়গাটি খুঁ/ড়ে একটি ট্রা/ঙ্ক উদ্ধার করা হয়। ট্রা/ঙ্ক খুলতেই সবাই স্তম্ভিত হয়ে যান। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলে ওঠেন, “আরে! এ তো নীহার বানু!”
তখন পর্যন্ত নীহার বানু নিখোঁজ ছিলেন প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস। উদ্ধার হয় তার ক/ঙ্কা/ল।
ত/দন্তে উঠে আসে, সুন্দরী নীহার বানুকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তার সহপাঠী আহমেদ হোসেন বাবু। কিন্তু নীহার তাতে রাজি হননি। এতে ক্ষু/ব্ধ হয়ে বাবু, তার বন্ধু সেতু, মিন্টু এবং আরও কয়েকজন ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে শহরের ‘মীনা মঞ্জিল’ নামের একটি বাড়িতে তাকে নিয়ে যান। সেখানে তার নিজের শাড়ি দিয়ে গ/লা পেঁ/চিয়ে শ্বা/সরো/ধ করে হ//ত্যা করা হয়।
নীহার বানু আত্মর/ক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। ধ/স্তাধ/স্তির একপর্যায়ে তিনি সেতুর হাতে কা/মড় দিয়েছিলেন। চিকিৎসা না করানোর কারণে সেই ক্ষ/ত বড় হয়ে যায়। আর সেই ক্ষ/তই পরে ত/দন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্রে পরিণত হয়।
দেশের একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এমন নৃ/শংস হ//ত্যা/কাণ্ডের খবর প্রকাশিত হলে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিচার দাবিতে মি/ছিল-মিটিং করেন। খু//নিদের ছবিসহ পোস্টার ছাপিয়ে তাদের ফাঁ//সির দাবিও জানানো হয়।
তৎকালীন অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, পরবর্তীতে স্টাফ রিপোর্টার আহমেদ শফিউদ্দিন এই হত্যাকাণ্ড প্রকাশ পাওয়া থেকে বিচারকাজ পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ কাছ থেকে অনুসরণ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন দেশে পত্রিকা ও গণমাধ্যমের সংখ্যা কম হলেও যে কটি ছিল, তারা প্রতিদিনই বিচার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। বিচিত্রার ‘নীহার বানু’ সংখ্যাটি একাধিকবার মুদ্রণ করা হয়েছিল।
তবে বি/চার হলেও সব অ/পরাধী আ/ইনের আওতায় আসেনি। এ ঘটনার মূল আসামি আহমেদ হোসেন বাবুসহ ফাঁ//সির দ//ণ্ডপ্রাপ্ত দুজন আজও প/লাতক। প্রচলিত রয়েছে, ঘটনার পর তারা দেশ ছেড়ে পা/লিয়ে যান। পরবর্তীতে শোনা যায়, বাবু জার্মানিতে চলে গিয়েছিলেন। তবে একজনের ফাঁ//সি কার্যকর করা হয়।
নীহার বানু হ//ত্যাকা/ণ্ড আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি আলোচিত অধ্যায়। এই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের নিষ্ঠা, সাংবাদিকদের ধারাবাহিক অনুসন্ধান এবং আন্দোলনকারীদের নিরলস প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে সব অ/পরাধী আইনের আওতায় এলে ইতিহাসটি হয়তো আরও পরিপূর্ণ হতো।
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র
বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল কতৃপক্ষ দায়ী নন।
নিউজ ডেস্ক