অনলাইন ২৫ জুলাই, ২০২৬
‘পালালেন কেন?’
‘তিনি তো পালাননি’
[লেখাটি বড়, বন্ধুরা পড়লে বাধিত হবো]
এক সপ্তাহের মধ্যেই এই দুটি কথা বলেছেন একই ব্যক্তি। এবং বলেছেন বর্তমানে দিল্লীতে অবস্থানকারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে। এবং যিনি বলেছেন তিনিও স্বনামধন্য ব্যক্তি, যিনি সমকালীন ইতিহাসের একজন নিরলস গবেষক বলে স্বীকৃত, অবিশ্রান্ত লেখক ও অবিরাম তাঁর বই প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের সেরা সংবাদপত্রে নিয়মিত কলামও লিখছেন।
মহিউদ্দিন ভাই, মহিউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আমার অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। আমি তাঁকে শুধু পছন্দই করি না, তাঁর দুটি বিস্ময়কর গুণ ও ক্ষমতার প্রতি আমি নতমস্তক শ্রদ্ধাশীল। একটির কথা উল্লেখ করেছি, তাঁর অসম্ভব শ্রমশীলতা ও সৃজনশীলতা। দ্বিতীয়টি হলো তিনি মার্জিতরুচি ও বন্ধুবৎসল।
তবে একই সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ অভিমান ও অনুযাগ, তিনি তাঁর সৃজনশীলতার প্রতি পুরো সুবিচার করেন না। আমি তাঁর সব বই পড়িনি, কমই পড়েছি, পড়তে পড়তে ভেতরে ভেতরে আমার আগ্রহ কমতে থাকে মূলত তাঁর গবেষণার অগভীরতা এবং ইতিহাসের ঘটনাবলী বর্ণনায় একটি চানাচুরের মতো মুখরোচক গল্প বলার ভঙ্গির কারণে। আমার সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন। স্বাভাবিক। তাঁর জনপ্রিয়তা আমার যোগ্যতার চেয়ে অনেক বেশি।
এখন সরাসরি কাজেরর কথায় আসি। গত ১০ই জুলাই ২০২৬ ‘প্রথম আল্’োয় তাঁর একটি কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম ‘দেশে ঢুকতে এক অস্থির হলে পালালেন কেন’। বলাবাহুল্য শেখ হাসিনার আগামি ডিসেম্বরে দেশে আসার ঘোষণা প্রসঙ্গে এই লেখা। পরে দেখলাম তিনি শুরুতে একাধিকবার সরাসরি ‘পালানো’ লেখেননি। লিখেছেন, “...প্রশ্ন হলো, দেশে ঢুকে পড়তে এত অস্থির হলে তিনি দেশ ছেড়ে গেলেন কেন?”
প্রথম আলোর সম্পাদকরা এক কাঠি সরেস হয়ে শিরোনাম দিয়েছেন ‘পালালেন কেন’। শেষর দিকে অবশ্য এক জায়গায় ‘প্রাণভয়ে পালিয়েছেন’ কথাটি লিখেছেন। মহিউদ্দিন সাহেব ‘ইন্ডিয়া টু-ডে’র খবর উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে নয়াদিল্লির কাছে সেনাবাহিনীর হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের তাঁকে স্বাগত জানানোর কথা উল্লেখ করেছেন। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ লিখেছিল, “...শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।” এএফপির খবর “...নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।”
খবরের এই উদ্ধৃতিগুলি তিনি দিয়েছেন তাঁর বই থেকে। চলতি এসব ঘটনা পর্যন্ত সংকলন করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বই, যার নাম ‘হাসিনা’, প্রকাশ করেছে বাতিঘর।
প্রথম আলোর নিবন্ধটিতে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান কি নির্বাসন, স্বেচ্ছায় গেছেন, না-কি যেতে বাধ্য করা হয়েছে ইত্যাদি প্রশ্ন তুলে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “...এর আগেও তিনি নির্বাসনে গেছেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট হত্যাকান্ড ও একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন প্রায় ছয় বছর।” লেখার ভঙ্গিটি এমন যেন ‘আগস্ট হত্যাকান্ড’ একটি মামুলি ঘটনা এবং হাসিনা ঢাকা থেকে ভারতে চলে গিয়েছিলেন! না, একটু পরেই লিখেছেন, ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা ব্রুসেলসে ছিলেন, সেখান থেকে জার্মানির বন শহরে যান। তথ্য হিসেবে ঠিক আছে। তবে মহিউদ্দিন সাহেব অদ্ভুদ কথা লেখেন যে, ঐ সময় অনেক জাসদ কর্মী জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন, “...হাসিনা কেন জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেননি, কেন ভারতে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলেন, এ নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে।”
ওরে গবেষক রে! ভারত শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশ নয়, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর বন্ধুভাবাপন্ন। হাসিনার স্বামী প্রফেসর ওয়াজেদ তখন জার্মানিতে পারমাণবিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষারত ছিলেন। তাঁর ও অন্য নিকট লেখকদের বই থেকে আমরা জানি যে, ১৫ই আগস্টের পরে (হাসিনা-রেহানা তখনও ঢাকায় পিতা-মাতার পরিবারের পুরো তথ্য জানেন না, তাঁদের সঙ্গে শিশু জয়-পুতুল ছিল) ওয়াজেদ সাহেব পরিবার নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কায় ছিলেন। বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক হাসিনা-রেহানাকে বোঝা মনে করছিলেন এবং জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমাউন রশিদকে ফোনে অনুরোধ করেছিলেন তাঁদের নিয়ে যেতে। ড. কামাল হোসেন অল্প সময়ের জন্য বনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমাউন রশিদের বাসায় যান এবং হাসিনা-রেহানার সমস্যায় মনোযোগ না দিয়ে হুট করে লন্ডনে চলে যান। এটা হুমাউন রশিদের পরামর্শ ছিল যে ভারত দু’বোনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হবে। সেখান থেকেই আবেদন জানানো হয় এবং ইন্দিরা গান্ধী গোপনীয়তা রক্ষা করে তাঁদের দিল্লি পাঠাতে বলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের সঙ্গে অভিভাবকের মতো আচরণ করেন। সন্তানদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়। অল্পদিন পরে রেহানা লন্ডনে চলে যান। ইউরোপের কোনো দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতেও পারতো, কিন্তু সরকারিভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা কি করতো? দুই বোনের তো তখন কোনো রাস্ট্রীয় অবস্থান ছিল না।
এসব কিছুই মহিউদ্দিন সাহেবের অজানা নয়। ১৫ই আগস্টের পরে হাসিনা-রেহানার দেশে আসা সম্ভব ছিল কি-না, কত হিং¯্র ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ও তারাই ছিল ক্ষমতায়। কে না উপলব্ধি করবে? অথচ মহিউদ্দিন আহমদ হাসিনাকে দোষারোপ করে লিখছেন, “...তিনি ইউরোপ কিংবা ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো চেষ্টা বা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। কখনো শুনিনি, তাঁকে বন কিংবা দিল্লি বিমানবন্দরে বিমানে উঠতে বাধা দেওয়া হয়েছে, অথবা বিমানে ওঠার পর ঢাকা বিমান বন্দর দিয়ে তাঁকে ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।”
শেখ হাসিনা পিতার পরিবারের সকলকে হারানোর পরে এতিম অবস্থায় দুই সন্তান নিয়ে জীবন-জীবীকার অনিশ্চয়তায় কেন দেশে আসবেন? আবার তিনি কি আসেননি? আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দল ও দেশের দায়িত্ব নিয়ে তিনি আসেননি? সে দায়িত্ব পালন করেননি?
এরপর কলামিস্ট চলে এসছেন “...২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাসনে যান। তিনি পদত্যাগ করেছেন না-কি করেননি, তাঁকে কি জোর করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, না-কি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন, এটা কি একটা আপসের (নেগোশিয়েটেড) প্রস্থান, না-কি প্রাণভয়ে পালিয়েছেন?”
‘তিনি তো পালাননি’
এই একই মহিউদ্দিন আহমদ এই কলাম প্রকাশের ৬ দিন পরে ১৬ই জুলাই চ্যানেল টুয়েন্টিফোর টিভি ‘মুক্তবাক’ অনুষ্ঠানে টক-শোতে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও উপস্থাপক মাহমুদুর রহমান মান্নার মুখোমুখি বসে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার ঢাকা থেকে ভারতে যাওয়া ছির একটা নেগোশিয়েটেড সেটেলমেন্ট (আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা বা নিষ্পত্তি)। কারণ উনি তো পালায় (পালিয়ে) যান নাই...যেভাবে ওবায়দুল কাদের গেছে। উনি বিমানে চড়ে গেছেন। বিমানে চড়ে তো পালানো যায় না। বিমান তো আমাদের পাইলটরা চালিয়ে নিয়ে গেছে এবং তারা ফিরেও এসেছে। এবং ওখানে তাঁকে রিসিভ করেছেন ওদের সামরিক কর্মকর্তারা। সবটাই তো আমি দেখছি যে কোনোটাই তো লুকো-ছাপা না।”
তিনি বলেন, পালিয়ে গেছেন বলা হয় এই অর্থে যে তিনি দেশে থাকলেন না কেন। ম্যানেজ করে চলে গেছেন। তিনি বলেন, হাসিনা গেছেন ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায়। তিনটি পক্ষ হলো বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যারা তাঁকে রেখে এসছে দিল্লিতে, শেখ হাসিনা ও ভারত। ভবিষ্যতে “আবার তিন পার্টি যদি সমঝোতা করে আরেকটা সিনারিও তৈরি করে তবে ইয়ে হবে।” তিনি বলেন, তবে সেটা করতে হলে এখানে যে পরিস্থিতি হবে তা সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় যেতে বাংলাদেশ পারবে কি-না নিকট ভবিষ্যতে, তাই তিনি মনে করেন, সেটা কতদিন লাগবে, কত বছর সেটাই প্রশ্ন।
মান্নার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে মহিউািদ্দন আহমদ বলেন, ফাঁসিতে ঝোলার আশঙ্কা থাকলে শেখ হাসিনা আসবেন না। তিনি প্রাণ বাঁচাতেই গেছেন। তিনি নিরাপদ থাকবেন নিশ্চিত হয়েই আসবেন। তিনি এলে আদালতে আত্মসমর্পণ করে আপিল করার অনুমতি চাইবেন এবং অনুমতি পেতেই পারেন, সে নজির আছে। সরকারকেও দেখাতে হবে যে ন্যায়বিচার হচ্ছে। আপিলে সাজা কমতে পারে, মামলা বইতলও হতে পারে, সে নজিরও তো আছে। সবটাই নির্ভর করবে পরিস্থিতির উপর।
টক-শোর শেষদিকে উপস্থাপকের প্রশ্ন ছাড়াই মহিউদ্দিন সাহেব নিজে যোগ করে বলেন, “আরেকটি জিনিস হচ্ছে, শেখ হাসিনা এমন ্একজন ব্যক্তি যিনি ক্ষমতা ছাড়া বাঁচতে পারবেন না। তাঁর ক্ষমতাপ্রীতি এত বেশি যার জন্য আমাদের দেশের আজকের এই পরিস্থিতি।”
মান্না সাহেব বলেন, ক্ষমতা ছাড়া তো আছেন। মহিউদ্দিন বলেন, সে তো বিদেশে। দেশে তিনি ক্ষমতাহীন থাকবেন, বায়তুল মোকারমে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াবেন, সে অবস্থা তিনি রিকনসাইল (মানিয়ে চলতে) করতে পারেন না। তিনি তো ৫ই আগস্টের ব্যাপারটা রিকনসাইল (মেনে নিতে) করতে পারছেন না।
সমকালীন ইতিহাসের সকল ঘটনা মহিউদ্দিন সাহেবের নখদর্পণে। তিনি জানেন, শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বিভিন্নরকম আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ১৫ বছরর পরে ক্ষমতায় গেলেন ১৯৯৬ সালে। এর মধ্যে তিনি এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকারে বিরোধীদলের আসনে বসেছিলেন। আবার ২০০১ সালে নির্বাচনে হেরে গেলে শান্তিপূর্ণভাবে খালেদার হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিরোধীদলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন। তারপরও গবেষক বলছেন তিনি ক্ষমতা ছাড়া বাঁচতে পারেন না।
২০০৪ সালে ক্ষমতা ছাড়া অবস্থায় বিরোধীদলে থাকতে বায়তুল মোকাররমে নয়. গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তৃতা করার সময় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মধ্যে তিনি বেঁচে যান। দুঃখজনক যে তাঁর দলের ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতাহীন উভয় অবস্থায় শেখ হাসিনা বহুবার হত্যাচেষ্টার মুখে বেঁচেই আছেন। তাই কে বলে তিনি ক্ষমতা ছাড়া বাঁচতে পারবেন না?
**প্রবীন বরেণ্য সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর পোস্ট থেকে সংগৃহিত-
Ashraf Ali Ashraf's Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল কতৃপক্ষ দায়ী নন।
নিউজ ডেস্ক