নওগাঁর আত্রাইয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দৈনিক ইনকিলাবের আত্রাই প্রতিনিধি সিফাত মাহমুদ ফাহিমের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিলের পর তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার। ঘটনার সময় ফাহিমের অবস্থান, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে তারা। পরিবারের অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশের জেরে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্রাব) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ফাহিমের পরিবারের সদস্যরা। এতে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা ওসমান আলী প্রামাণিক, মা শেফালী বেগম, ভাই ফিরোজ প্রামাণিক ও খালাতো ভাই নাজমুল ইসলাম।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ জুন আত্রাইয়ের ৮ নম্বর আমলকী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফাহিমের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে মামলা করেন নাজিম উদ্দিন মণ্ডল। তিনি আত্রাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং উপজেলার ২ নম্বর ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ ফাহিমের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৮৫ ও ৫০০ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করে বলে জানানো হয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর নওগাঁর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন ফাহিম। আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ফাহিমের পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন তিনি ঢাকার সাভারে নিজের ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁকে আত্রাইয়ের ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে উপস্থিত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। এ তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার সময় তাঁর অবস্থান নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক নথি ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে তারা।
পরিবারের সদস্যরা আরও অভিযোগ করেন, তদন্তে গ্রাম পুলিশ মো. আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ করা হলেও তদন্তের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি বলে তিনি জানিয়েছেন। এ-সংক্রান্ত একটি বক্তব্যের রেকর্ডিং তাঁদের কাছে রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া দুই সাক্ষী মো. সবুজ হোসেন ও মো. শহিদুল ইসলাম হলফনামার মাধ্যমে মামলার বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন- এমন দাবি করেছে পরিবার। আরেক সাক্ষী মো. আল আমিন খাঁ দেশের বাইরে রয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পরিবারের মতে, তদন্ত কর্মকর্তা কী কী প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, সাক্ষীদের বক্তব্য কীভাবে নিয়েছেন এবং ঘটনার সময় ও স্থান কীভাবে যাচাই করেছেন, তা মামলার মূল নথি ও কেস ডায়েরি পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ফাহিমের পরিবারের দাবি, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অনিয়ম ও সরকারি সম্পদ সরানোর অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই বাদী নাজিম উদ্দিন মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি মালামাল সরিয়ে বাড়িতে নেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন মণ্ডলকে আটক করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে দৈনিক ইনকিলাবে ‘আত্রাইয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ সরানোর অভিযোগ, ডিসিকে ইউএনওর চিঠি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
পরিবার আরও জানায়, গত ১২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ মামলায় ওই সাবেক চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার হওয়ার পর দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর আগেও ফাহিমসহ স্থানীয় সাংবাদিকেরা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
এসব সংবাদ প্রকাশের কারণে আক্রোশ থেকে ফাহিমকে চাঁদাবাজির মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। স্থানীয় সচেতন মহল ও সাংবাদিকদের একাংশের মধ্যেও এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তবে সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে মামলার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী নাজিম উদ্দিন মণ্ডল ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সেলিমুজ্জামানের বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। ফলে তাঁদের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে ফাহিমের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলাটির নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের দাবি জানানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। একই সঙ্গে বাদী জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন- এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান পরিবারের সদস্যরা।
তাঁদের মতে, মামলার মূল নথি, কেস ডায়েরি, সাক্ষীদের বক্তব্য, ঘটনার সময় ফাহিমের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পরিবারের দাবি, সাংবাদিকতার মাধ্যমে অনিয়মের তথ্য প্রকাশের কারণে ফাহিম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগগুলোর যথাযথ বিচারিক পর্যালোচনা এবং ফাহিমের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।