রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি খুলনার ভৈরব সেতু: অগ্রগতি মাত্র ২০%, চুক্তি বাতিলের পথে ঠিকাদার

নিউজ ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৭ pm
পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি খুলনার ভৈরব সেতু: অগ্রগতি মাত্র ২০%, চুক্তি বাতিলের পথে ঠিকাদার

এসকে জামান বিশেষ প্রতিবেদক।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও থমকে আছে খুলনার ভৈরব সেতু নির্মাণকাজ।খুলনা শহরের সঙ্গে দিঘলিয়া উপজেলা ও নড়াইল জেলাকে সংযুক্তকারী এ গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ তিন দফা সময় বাড়িয়েও মাত্র ২০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২৮টি পিলারের মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে কেবল ১৭টি। প্রায় দেড় বছর ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখায় স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।সওজ সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব নদের নগরঘাট এলাকায় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালের ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু হয়।চুক্তি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলেও প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। এ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬২ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, সওজ বিভাগের কিছু কর্মকর্তার অবহেলা ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মানসিকতার কারণেই প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। তাদের দাবি, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, নকশা পরিবর্তন, বাজেট বৃদ্ধি এবং সময় বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। পরে তারা বদলি বা অবসরে চলে গেলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।অন্যদিকে সওজ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, প্রকল্পের নকশায় প্রয়োজনীয় কারিগরি পরিবর্তন এবং নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় কাজের গতি মন্থর হয়েছে।প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক নকশায় নদীর মাঝখানে দুটি পিলার রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এতে নদীতে পলি জমে ভরাট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় নকশা সংশোধন করে পিলার দুটি দুই তীরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশোধিত নকশায় মূল স্টিল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ১৫১ মিটার।এছাড়া সড়ক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেতুর নকশায় আরও পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রথম নকশায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন না থাকলেও সংশোধিত নকশায় দুই পাশে পৃথক লেন সংযোজন করা হয়েছে।ফলে সেতুর প্রস্থ দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটারে উন্নীত হবে। একই সঙ্গে নগরের মহসিন মোড়ে রেললাইনের ওপর কংক্রিটের গার্ডারের পরিবর্তে স্টিলের গার্ডার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।সওজ সূত্র জানায়, চার লেনবিশিষ্ট মূল সেতুটি নদীর ওপর প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতায় পিসি গার্ডার নকশায় নির্মিত হবে, যাতে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক থাকে। সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য দুই পাশে তিন কিলোমিটারের বেশি উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা শহর প্রান্তে নগরের মহসিন মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ২৭ কিলোমিটার এবং দিঘলিয়া প্রান্তে নদ থেকে উপজেলা মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নদীর দুই পাড়ে প্রায় সাড়ে ১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। খুলনা শহর প্রান্তে শিল্প-কারখানা থাকায় শুরুতে জমি বুঝে পেতে কিছুটা জটিলতা দেখা দিলেও পরে সওজ বিভাগ জমির দখল বুঝে নেয়। তবে এরপরও প্রায় দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধি পাওয়া যায়নি। তবে মোবাইল ফোনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ বলেন, “প্রকল্পের পরিবর্ধিত নকশা হাতে না পাওয়ায় কাজের গতি কমেছে। এছাড়া শুরুতে সময়মতো জমি বুঝে না পাওয়ার কারণেও নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দেয়।”তবে সওজ বিভাগের খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, “গত দেড় বছরে ডজনখানেক চিঠি দেওয়ার পরও ঠিকাদার কাজ করেননি। এজন্য চুক্তি বাতিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে।”সওজ বিভাগের খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, “আমাদের অধিদপ্তর থেকে এর আগে এত বড় সেতু নির্মাণ করা হয়নি। ফলে শুরুতে কিছু জটিলতা ছিল। বর্তমানে ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও প্রকল্প সংশোধনের কাজ চলছে। দ্রুত সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে।”প্রকল্প ব্যয়ের হিসাবে মূল সেতু নির্মাণে ৩০২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২৮১ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট অর্থ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে।এদিকে ভৈরব নদ খুলনা শহর থেকে দিঘলিয়া উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সেতুটি নির্মিত হলে খুলনা, দিঘলিয়া ও নড়াইল অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের এখনো প্রতিদিন নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে নদী পারাপার করতে হচ্ছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!