অতিরিক্ত ফি আদায়, পর্যাপ্ত শিক্ষা-সুবিধার অভাব, নিম্নমানের খাবার ও পানি এবং শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন সমস্যার অভিযোগ তুলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে ক্লাস বর্জন করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অংশ নেন তাদের অভিভাবকরাও।
কয়েকশ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের ফি আদায় বন্ধ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবি জানানো হয়।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন খাতের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ল্যাব ফি, ম্যাগাজিন ফি, কম্পিউটার ফিসহ আরও কয়েকটি খাত রয়েছে।
তবে এসব ফি নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাদের। শিক্ষার্থীদের দাবি, যে সেবার জন্য ফি নেওয়া হচ্ছে, সেই সেবার বাস্তবায়ন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় এসব ফি আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শুধু অতিরিক্ত ফি নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান আন্দোলনকারীরা।
তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি খাবার পানি নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পানি ও খাবারের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি।
এ ছাড়া কয়েকটি শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামোগত অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ করেন তারা। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে—এমন শ্রেণিকক্ষের বিষয়টি দ্রুত সমাধানের দাবি জানান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
আন্দোলনকারীরা জানান, এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের কাছেও সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন তারা।
তবে অভিযোগ রয়েছে, তাদের দাবিগুলো যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবাদ করায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে। পরে তারা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সকালে ক্লাস বর্জন করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন কয়েকশ শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন বেশ কয়েকজন অভিভাবক। তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো খাতে ফি নেওয়া হলে সেই খাতে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ, ক্যান্টিন, খাবার পানি ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার মান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের খবর পেয়ে পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের গভর্নিং বডি জরুরি বৈঠকে বসে।
বৈঠকে শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের দাবি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহা. তালিম হোসেন অতিরিক্ত ফি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানে যেসব অতিরিক্ত ফি ধরা হয়েছে, সেগুলো সমন্বয় করে সমস্যার সমাধান করা হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক সামছুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও উত্থাপিত সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান চান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
তাদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন ফি যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, শিক্ষা উপকরণ ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হবে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে একটি নিরাপদ, সুষ্ঠু ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকবে।