তারাকান্দায় রোহিঙ্গা নারীকে ভোটার করতে ভুয়া সনদ
চেয়ারম্যান-প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ
তারাকান্দা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ভুয়া পরিচয়ে এক রোহিঙ্গা নারীকে ভোটার করার চেষ্টার ঘটনায় এবার সামনে এসেছে জাল ও ভুয়া সনদ তৈরির অভিযোগ। কক্সবাজার থেকে ওই নারীকে তারাকান্দায় এনে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, ট্যাক্স রশিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্রসহ একাধিক নথি সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব নথি তৈরিতে রামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বুলে ও বাট্রা মিলন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রধান শিক্ষক প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এটিকে ভুলবশত হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাবেয়া বেগম নামে ওই নারী তারাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করতে আসেন। আবেদনে তিনি নিজেকে রামপুর ইউনিয়নের বাহেলা গ্রামের বাসিন্দা এবং পিতার নাম আব্দুল গফুর ও মাতার নাম আমিনা খাতুন উল্লেখ করেন।
কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় তাঁর পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নির্বাচন অফিস সূত্রের দাবি, পরে ওই নারী কক্সবাজারের রোহিঙ্গা নাগরিক বলে স্বীকার করেন। ভুয়া পরিচয়ে ভোটার হয়ে পরবর্তীতে পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি।
নির্বাচন কার্যালয়ে জমা দেওয়া নথির মধ্যে রামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ, ট্যাক্স রশিদ এবং অঙ্গীকারনামা ছিল। পাশাপাশি বাট্রা মিলন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্রও জমা দেওয়া হয়। ওই প্রত্যয়নপত্রে নারীটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই নারীকে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে একটি চক্রের মাধ্যমে এসব নথি সংগ্রহ করা হয়। অর্থের বিনিময়ে নথি তৈরি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান বলেন, “প্রত্যয়নপত্রটি আমার বিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ভুলবশত হয়ে থাকতে পারে।”
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বুলের বক্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তারাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মোহাম্মদ আশিকুর রহমান সরকার বলেন, “ভুয়া তথ্য ও কাগজপত্র ব্যবহার করে ভোটার হওয়ার চেষ্টার বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর ওই নারীকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যবহৃত কাগজপত্রের বিষয়েও যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্তে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে ওই নারীর নামে জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ ও অন্যান্য প্রত্যয়ন কীভাবে তৈরি ও ইস্যু হয়েছে, তা বের করা হোক। একই সঙ্গে এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা চক্র জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এখন তদন্তেই পরিষ্কার হবে—কক্সবাজারের একজন রোহিঙ্গা নারী কীভাবে তারাকান্দার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে সরকারি-বেসরকারি একাধিক নথি সংগ্রহ করলেন এবং এসব নথি তৈরির পেছনে কারা জড়িত ছিলেন।