মোঃ মোশফিকুর রহমান স্বপন
সুনামগঞ্জ:
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় সরকারকে প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মাছ আহরণ করতে পারছেন না কালিজানা বিলের মৎস্যজীবীরা। জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা খাস জলাশয় ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে হাজার টাকার বিনিময়ে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ফলে কোটি টাকার জলমহালের ইজারাদারদের সঙ্গে হাজার টাকার জলাশয় ইজারাদারদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
জলমহালে মাছ ধরতে জাল ফেললে পুলিশ পাঠিয়ে মাছ আহরণ বন্ধ করে দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন—এমন অভিযোগ করেছেন কালিজানা বিল গ্রুপ মৎস্যজীবী সমিতির ইজারাদাররা।
এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কালিজানা বিল গ্রুপের মৎস্যজীবীরা। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও জলমহালসংলগ্ন খাস জলাশয় ইজারা দেওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
এতে জলমহাল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
মাছ আহরণকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রবিবার সরেজমিনে কালিজানা জলমহালে গিয়ে দেখা যায়, ১৪টি মৌজা নিয়ে ২৮১ একরের বেশি আয়তনের কালিজানা জলমহালের পানি নামতে শুরু করেছে। জলমহালের ভাটি এলাকায় বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের সামনে কালিজানা নদীতে জালের বাঁধ দিয়ে মাছ আটকানো ও আহরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জলমহালের ইজারাদাররা।
জাল ফেলার পর জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা জলাশয়ের ইজারাপক্ষ এতে বাধা দেয়। পরে পুলিশও ঘটনাস্থলে এসে জাল ফেলতে বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। উপস্থিত পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
কালিজানা জলমহালের ইজারাদাররা জানান, এই জায়গায় জাল না ফেলে অন্য কোনো জায়গা থেকে মাছ আহরণের সুযোগ নেই। জাল না থাকায় ভাটির পানির টানে নদী হয়ে জলমহাল থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও জানান।
জানা যায়, বার্ষিক ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় তিন বছরের জন্য কালিজানা বিল গ্রুপ মৎস্যজীবী সমিতি জলমহালটি ইজারা পায়। দুই বছর উন্নয়ন শেষে চলতি বছর মাছ আহরণের পর ইজারার মেয়াদ শেষ হবে। তিন বছরে ভ্যাটসহ প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে সরকার। এ ছাড়া বিল পাহারা, বাঁশ কাটা এবং অন্যান্য কাজে আরও লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে ইজারাদারদের।
কয়েক কোটি টাকা খরচের পর মাছ আহরণের সময়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকায় জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা সরকারি জলাশয়গুলো খাস আদায়ের মাধ্যমে ইজারা না দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। এতে প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন জলমহালের ইজারাদারপক্ষ।
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ছয় মাসের জন্য খাস আদায় না করতে আদেশ দেন আদালত। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিতাদেশ আরও ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি করেন আদালত—এমন দাবি ইজারাদারপক্ষের।
তবে তাদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বদলির পূর্বমুহূর্তে গত জুলাই মাসে জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন মৌজায় খাস আদায়ের মাধ্যমে ইজারা দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষ। ইজারার আদেশ পাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জলমহালের মাছ আহরণে বাধা দিচ্ছেন জলাশয় ইজারাদাররা বলে অভিযোগ করেন তারা।
কালিজানা মৎস্যজীবী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. বুলবুল বলেন, “সরকারকে কোটি টাকার উপরে রাজস্ব দিয়ে বিল এনেছি। আরও কোটি টাকা দিয়ে দুই বছর উন্নয়ন করলাম। এ বছর ফিশিং বছর। আমরা ফিশিং করার আগেই ছোট ছোট কয়েকটি জলাশয় প্রশাসন ইজারা দিয়ে দিয়েছে। অথচ এর আগেই আমার রিটের আদেশে আদালত এসব খাস ইজারার ওপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “এখন মাছ ধরার সময়ে এসে ভাটিতে জাল ফেলতে দিচ্ছে না উপজেলা প্রশাসন ও তৃতীয় পক্ষ। ভাটিতে জাল না ফেলে কীভাবে মাছ ধরব আমরা? এর আগে এই ছোট ছোট জলাশয় কোনোদিন ইজারা হয়নি। আদালতের আদেশ অমান্য করে নতুন করে এগুলো ইজারা দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন কোন স্বার্থে এটি করছে জানি না। এর কারণে আমাদের মৎস্যজীবী সমিতির জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন পার করছেন।”
এ বিষয়ে ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, “আমার এসিল্যান্ড খাস জায়গার ভিত্তিতে ইজারা দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা জানার পর ইজারা বাতিল করা হয়েছে। জলমহালের ইজারাদার যদি প্রয়োজন মনে করেন খাস জায়গায় জলমহালের মৎস্য আহরণ করতে, তাহলে আদালতে তাদের রিটের প্রেক্ষিতে করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, “আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে খাস আদায় আইন পরিপন্থী কাজ। জলমহালে মৎস্য আহরণের যে সমস্যা, আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেব। সরকারকে যারা এত টাকা রাজস্ব দিয়েছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, “আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে খাস ইজারা দিয়ে থাকলে যারা দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”