মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

২৪ ঘণ্টা অভিযান, এক মাসে উদ্ধার ৭ বিদেশি পিস্তল; তবুও কাটছে না নগরবাসীর আতঙ্ক

মোঃগোলাম কিবরিয়া
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ pm
১৪
২৪ ঘণ্টা অভিযান, এক মাসে উদ্ধার ৭ বিদেশি পিস্তল; তবুও কাটছে না নগরবাসীর আতঙ্ক
ছবি সংগ্রহ ।

গোলাম কিবরিয়া

খুলনা

খুলনায় খুনোখুনি, সন্ত্রাস ও মাদক নিয়ন্ত্রণে র‍্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলছে অভিযান। গত এক মাসে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও মাদক কারবার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে এখনো বিরাজ করছে অজানা আতঙ্ক।

কৌশলে পরিবর্তন এনেছে কেএমপি

গত ২ আগস্ট খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন *মোঃ সাজ্জাদুর রহমান*। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নগরীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরও নগরীতে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। গত ১৯ আগস্ট লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে নাজমুল ও মঞ্জুরুল ইসলাম নামে দুই যুবক হত্যার শিকার হন। এর আগে ১৮ আগস্ট নগরীর রায়েরমহল এলাকা থেকে চার বছরের শিশু *মিমকে* অপহরণের অভিযোগে *রাজু* নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। এছাড়া ২৬ আগস্ট টুটপাড়া এলাকায় *মামুন মীর* নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন।

এসব ঘটনার পর নগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়।

কেএমপি কমিশনার বলেন, "দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকেই অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনার ধরন ও কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। গত এক মাসে সাতটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার হয়েছে।"

তিনি জানান, ২৬ আগস্ট টুটপাড়ায় মামুন মীরকে গুলি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দারোগাপাড়া এলাকা থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ডিবিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে দুজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের দাবি, গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে রাজধানী থেকেও চারজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার ও গুলি উদ্ধার করা হয়।

কমিশনারের ভাষ্য, গত এক মাসে নগরীতে খুনোখুনি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং মাদক কারবারিদের তৎপরতাও আগের তুলনায় কমেছে। সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সুন্দরবনেও যৌথ অভিযানের সাফল্য

অন্যদিকে সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করতে যৌথ অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে র‍্যাব-৬। গত ৩১ আগস্ট র‍্যাবের কাছে সুন্দরবনের পাঁচ বাহিনীপ্রধানসহ *৫৯ জন দস্যু* আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেওয়া হয়।

র‍্যাব-৬ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ নিস্তার আহম্মেদ জানান, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে র‍্যাব কাজ করছে। গত ২ মার্চ থেকে সুন্দরবনে জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র‍্যাবের নেতৃত্বে কোস্ট গার্ড, পুলিশ, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘রি-স্টার্ট পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

এসব অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৫৯ জন দস্যুর আত্মসমর্পণের পাশাপাশি *৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি* উদ্ধার করা হয়েছে।

র‍্যাবের মহাপরিচালক *আহসান হাবীব পলাশ* পরদিন র‍্যাব-৬ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে র‍্যাবের নেতৃত্বে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

আট মাসে বিপুল অস্ত্র-মাদক উদ্ধার

র‍্যাব-৬ এর তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে *৬৩৪ জন সন্ত্রাসীকে* গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে *৩৫ জন ভিকটিমকে* উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে *৪৬টি অস্ত্র, ১৯৫ রাউন্ড গুলি, ১৩টি ম্যাগাজিন ও ৮৪টি বোমা-কটেল*।

মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার হয়েছে *১ হাজার ৯৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৪২ হাজার ১৯ পিস ইয়াবা, ৩২৩.২ কেজি গাঁজা, ২৩৮.৮৪ লিটার দেশি মদ, ১ হাজার ২৩৯ বোতল ফেয়াড্রিল, ১.৫১ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ৬ হাজার ৯৯৫ বোতল ইসকাফ সিরাপ, ২২ হাজার ৮২৪ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৫ হাজার ২৯৮ বোতল উইনকেরিক্স এবং ৯৬ হাজার পিস পাতার বিড়ি*।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহম্মেদ বলেন, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর অপরাধের রহস্য উদঘাটনে র‍্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। লবণচরার আশিবিঘায় জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সন্ত্রাসী *আল আমিন ওরফে সাইফি*কে হত্যাকাণ্ডের দুই দিনের মধ্যেই গোপালগঞ্জ সদর থানার মাঝিরগাতি বাজার থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

*আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি নগরবাসীর*

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, বিপুল অস্ত্র-মাদক উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের পরও নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার ও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, র‍্যাব-পুলিশের চলমান যৌথ অভিযান আরও জোরদার হবে, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলো ভেঙে দিয়ে খুলনাকে একটি নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!