ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ চাই না: রাষ্ট্রপতি
মোঃ মাহফুজুর রহমান ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ চান না তিনি। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ নিজ মতাদর্শ প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। সব রাজনৈতিক দলকে বলব—আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতবাদ প্রচার করবেন, কিন্তু কখনো সংঘাতে জড়াবেন না।” গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। মেডিকেল কলেজেও আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে বলে জানান তিনি।
ভুল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও পূরণ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দুটি উপজেলায় ইউএনও যোগ দিয়েছেন এবং কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিমানবন্দর চালু ও ভবিষ্যতে সচল রাখতে হলে জেলায় শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। বর্তমানে জেলায় পর্যাপ্ত কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এ কারণে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, চীন থেকেও বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে চীনের রাষ্ট্রদূত ঠাকুরগাঁও সফর করেছেন এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার অতীত স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমরা অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে আজ এখানে এসেছি। এ রকম মৃত্যু ও রক্তপাত আমরা আর দেখতে চাই না।” তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সমাধানের আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব নাগরিক যেন সমঅধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নতুন খেলার মাঠ, আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়, সমবায় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং পীরগঞ্জে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত বিমানবন্দরটি চালুরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রবাসে কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে জানান তিনি। তবে তরুণদের শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান তৈরির আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
তরুণদের মাদকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁওকে মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন। ব্যবসায়ীদেরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে জেলায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিজ জেলার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের কারণে আগের মতো সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমে গেলেও তিনি ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে তিনি যথাসাধ্য সবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন বলেও জানান।
নিজের শৈশব ও শিক্ষাজীবনের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে তার জন্ম, শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে। জীবনের গঠনে শিক্ষকদের অবদানের কথা স্মরণ করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ঠাকুরগাঁওবাসীর শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।”
নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়াসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম নিজ জেলা সফর। দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান তিনি। সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা রয়েছে।