হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাও থামাতে পারেনি জিরানির দখল বাণিজ্য, নেপথ্যে কারা?
এসকে শুভ গাজীপুর কোনাবাড়ী কাশিমপুর প্রতিনিধিঃ
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, সড়কের নির্ধারিত সীমানা এবং জনস্বার্থ—কোনোটিরই যেন তোয়াক্কা নেই। চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের জিরানি বাজার এলাকায় সার্ভিস লেন ও ফুটপাত দখল করে একের পর এক দোকানপাট, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা ও যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে পথচারীদের চলাচলের জায়গা; একই সঙ্গে কমেছে মহাসড়কের কার্যকর প্রশস্ততা। ফল হিসেবে বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।
সাম্প্রতিক সময়েও জিরানি বাজারে ফুটপাত ও মহাসড়কের জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ এসেছে। এমনকি মহাসড়কের সীমানা থেকে নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন ও ফুটপাতের বড় একটি অংশ দখল করে বসানো হয়েছে বিভিন্ন দোকান। কোথাও স্থায়ী দোকানের সামনের অংশ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে সড়কের দিকে। আবার কোথাও পথচারীদের জন্য নির্ধারিত ফুটপাতের ওপরই বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান।
ফলে ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ নেই অনেক জায়গায়। পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কের পাশে দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি পিকআপ, অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মাহিন্দ্রাসহ বিভিন্ন যানবাহনের স্ট্যান্ডও গড়ে উঠেছে সড়কের পাশে। এসব যানবাহন যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকায় আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে চলাচলের জায়গা।
জিরানি বাজার এলাকায় অবৈধ স্ট্যান্ড, হকার মার্কেটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তারের অভিযোগ আগেও উঠে এসেছে।
এদিকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সাইনবোর্ড থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন দোকান ও স্থাপনা যুক্ত হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—নিষেধাজ্ঞা যদি কার্যকর থাকে, তাহলে তার আওতাধীন জায়গায় নতুন করে স্থাপনা গড়ে উঠছে কীভাবে? আর যদি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানে, তাহলে দখল উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি হচ্ছে কেন?
অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো—এই দখল কি শুধুই ব্যক্তিগতভাবে দোকান বসানোর ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সংগঠিত ব্যবস্থাপনা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দখল বাড়লেও স্থায়ীভাবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দখলদারদের পেছনে কারও প্রভাব বা প্রশ্রয় রয়েছে কি না বা কার ইন্ধনে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চলছে? অবৈধ স্ট্যান্ড পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? দখল করা জায়গা ব্যবহারের বিনিময়ে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন হচ্ছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি।
আর দখলের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে যান চলাচলে।জিরানি বাজার চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের ব্যস্ত একটি অংশ। এ পথে বিপুল সংখ্যক পোশাক শ্রমিক, শিক্ষার্থী, সাধারণ যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। জিরানি এলাকায় সড়ক অবরোধ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে উভয় দিকে দীর্ঘ যানজটের নজিরও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সার্ভিস লেন ও ফুটপাত দখলের পাশাপাশি যানবাহনের স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে কর্মস্থলগামী শ্রমিকদের সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও যানজটে আটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ফুটপাত নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু ফুটপাত যদি দোকান ও ব্যবসার জায়গা হয়ে যায়, তাহলে পথচারীদের মূল সড়কে নামা ছাড়া বিকল্প থাকে না। আর ব্যস্ত মহাসড়কে এভাবে হাঁটতে গিয়ে যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।
জিরানি বাজার এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে পথচারীদের ঝুঁকির বিষয়টি সংবাদে এসেছে। অর্থাৎ ফুটপাত দখল, সড়কের জায়গায় ব্যবসা এবং পথচারী পারাপারের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো একসঙ্গে জননিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে বাজার পরিচালনার ক্ষেত্রে ইজারার শর্ত মানা হচ্ছে কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আর যদি ইজারার আওতায় বাজার পরিচালনা করা হয়, তাহলে মহাসড়ক, সার্ভিস লেন কিংবা পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকার কথা নয়। অথচ বাস্তবে যদি সড়কের জায়গা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে ইজারার শর্ত এবং তা তদারকির বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু দোকানদার বা হকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; দখল তৈরির সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তবে এবিষয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বাজার পরিচালনা কিংবা জনসাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাইনবোর্ড কিংবা উচ্ছেদের ঘোষণা নয়—মহাসড়কের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ স্ট্যান্ড সরিয়ে দখলের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
নইলে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা যদি সাইনবোর্ডে থাকে আর বাস্তবে দখলদারদের দখলই বহাল থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—জিরানী বাজারে আসলে কার্যকর হচ্ছে কার আইন?
এসকে শুভ
গাজীপুর কোনাবাড়ী কাশিমপুর প্রতিনিধি
তারিখ ৫-৮-২০২৬ ইং