মাদারগঞ্জ (জামালপুর) উপজেলা প্রতিনিধি:-
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ৪৩ নং ফুলজোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা চললেও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াদুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রায়ই দেরিতে বিদ্যালয়ে আসেন এবং দুপুরের আগেই বিভিন্ন অজুহাতে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়টি উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের ফুলজোড় এলাকায় অবস্থিত। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৮৮ বছরের পুরোনো এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১০৮ জন। এর মধ্যে উপবৃত্তি পায় ৩৮ জন এবং বৃত্তি পেয়েছে একজন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন চারজন। তবে একজন শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত থাকায় বর্তমানে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনজন শিক্ষক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াদুল ইসলাম নিজের ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। ফলে নিয়মিত পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকায় তাঁর অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সরেজমিনে মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা চললেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াদুল ইসলাম বিদ্যালয়ে নেই। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, তিনি সকাল ১১টার দিকে অফিসের কাজের কথা বলে বিদ্যালয় থেকে চলে যান। অথচ ওই দিন পরীক্ষা শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টায় এবং চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এর আগের দিন সোমবারও তিনি দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয় থেকে চলে যান বলে জানা গেছে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রায়ই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। বিদ্যালয়ে এলেও সকাল ১১টা কিংবা ১২টার মধ্যেই বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে চলে যান। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক জাহিদ হাসান ও মোছা. মহসিনা আক্তার নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার বলে, দুইজন শিক্ষক আমাদের ক্লাস নেন। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঠিকমতো বিদ্যালয়ে থাকেন না।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর বিদ্যালয়টি স্লিপের বরাদ্দ পেলেও সেই অর্থে দৃশ্যমান কোনো কাজ করা হয়নি। এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষকদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, স্লিপের বরাদ্দের টাকা কীভাবে ব্যয় করা হয়, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না। সবকিছু প্রধান শিক্ষকই করেন।
বিদ্যালয়ের আরও একটি উদ্বেগজনক চিত্র হলো—নিবন্ধিত ১০৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে প্রায় ৫০ জন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পাঠদান কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ওপর থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধেই দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে না থাকায় পাঠদান কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াদুল ইসলাম মাদারগঞ্জ উপজেলা যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী মৌসুমী আক্তারের স্বামী। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর স্ত্রীর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবের কারণে তিনি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রিয়াদুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিক নাম্বার থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জানতে মাদারগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে জেনে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন। তবে এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
বিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত উপস্থিতি, প্রশাসনিক কার্যক্রমের সুষ্ঠু পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।