পটুয়াখালীর গলাচিপার দূরবর্তী চরকারফারমা এলাকার শিশুদের জন্য প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। বাড়ি থেকে বের হলেই চোখে পড়ে একের পর এক খাল। একটি বা দুটি নয়, পরপর পাঁচটি খাল পার হয়ে বিদ্যাপিঠে পৌঁছাতে হয় কোমলমতি এসব শিশুদের। শুকনো পথ না থাকায় হাতে বই-খাতা উঁচু করে ধরে দীর্ঘ পথ সাঁতার কেটেই তাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এরপর সেই ভেজা পোশাকেই সারাদিন শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠ গ্রহণ করতে হয় তাদের। অদম্য এই শিশুদের সংখ্যাও কম নয়—প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ৫১ জন (ছাত্র ২৬ ও ছাত্রী ২৫)। তবে ভৌগোলিক দুর্গमता ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় বছরের ১২ মাসই এই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফলে দিন দিন বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ছে অনেক শিশু।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সরেজমিনে চরকারফারমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসিবুলের সঙ্গে। চরের শেষ সীমানার ফরেস্ট সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা হাসিবুল জানায়, "বাড়ির পাশের বন্ধু জহিরুলসহ প্রতিদিন ৬-৭ জন মিলে পাঁচটি খাল সাঁতরে স্কুলে আসি। বৃষ্টির দিনে বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়।"
একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিশু আসাদুল নিজের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলে, "সারা দিন ভিজে কাপড়ে থাকলে শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। তখন কয়েক দিন স্কুলেই আসতে পারি না। বাড়িতে মাছ ধরার একটা নৌকা থাকলেও বাবা তা নিয়ে নদীতে যান, তাই সাঁতার কাটা ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না।"
গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অংশ এই চরকারফারমা। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এবং আগুনমুখা, রামনাবাদ ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত এই চরটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এর ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ। কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ ও চলাচলের পথ বছরের অধিকাংশ সময় নিমজ্জিত থাকে। চরে বসবাসকারী ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবারের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "এখানকার অধিবাসীদের নিজেদের উদ্যোগে সড়ক নির্মাণের সামর্থ্য নেই। শিশুদের শিক্ষার স্বার্থে হলেও দ্রুত রাস্তা তৈরি করা প্রয়োজন।"
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিন জানান, যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বাড়বে।
শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গলাচিপা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, "স্কুলে যাওয়ার পথ না থাকার বিষয়টি সত্য। বর্তমানে হাতে কোনো বিশেষ সরকারি বরাদ্দ নেই, তবে পরবর্তীতে নতুন বরাদ্দ পেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাস্তা তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে জানান, সমস্যাটি দ্রুত সমাধান কল্পে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও স্থানীয় সংসদ সদস্য/প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে।
বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, "উক্ত দুর্গম এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"