অনলাইন: ১৯ জুলাই ২০২৬
,কৌশল এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষ কথা নয়। এমন ম্যাচে দরকার হয় একটা জাদুকরি মুহূর্তের। মেসি, ইয়ামাল বা অন্য কারও পায়ে তৈরি হওয়া তেমন এক মুহূর্তেই হয়তো লেখা হয়ে যাবে শিরোপার ভাগ্য।
লড়াইটা লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং লিওনেল স্কালোনিরওএক্স
এক পাশে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। বল দখলে রেখে খেলাই যাদের প্রধান অস্ত্র, সঙ্গে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই চেপে ধরে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা। অন্য পাশে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা।
শক্ত রক্ষণ, ঝড়ের গতির পাল্টা আক্রমণ আর লিওনেল মেসিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর আক্রমণভাগ—এটাই তাদের শক্তি। আজ রাতে নিউ জার্সির ফাইনালে যে দল নিজেদের ছক প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে, জয় শেষ পর্যন্ত তাদেরই হবে।
আর্জেন্টিনার অনুশীলনে মেসি ও কোচ স্কালোনিএএফপি
স্পেনের রণকৌশল
স্পেনের আসল শক্তি বল নিয়ন্ত্রণে রাখা। শুধু বল দখলে রাখাই নয়, বল হারালে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে সেটা ফিরিয়ে নেওয়াতেও তারা দারুণ দক্ষ। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বুঝে সেভাবেই ছক সাজায় তারা। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালেই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে।
সেদিন স্পেনের কাউন্টার-প্রেসিং এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের রীতিমতো নিশ্বাস নিতে দেয়নি। পুরো ম্যাচে ফ্রান্সকে কোনো জায়গাই ছাড়েনি তারা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও একই কৌশলে তাদের আক্রমণের গতি থামিয়ে দিতে পারে স্পেন।
স্পেনের খেলোয়াড়েরা ছোট ছোট পাসে ধৈর্য ধরে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করেন। লক্ষ্য একটাই—প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বারবার জায়গা বদলাতে বাধ্য করে ফাইনাল থার্ডে সুযোগ তৈরি করা।
বিশেষ করে ফুলব্যাক আর সেন্টারব্যাকের মাঝের ফাঁকা জায়গা ধরেই আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে তারা। প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার নড়াচড়া করিয়ে ছোট ছোট ফাটল বের করাই তাদের খেলার ভিত্তি।
স্পেনের আক্রমণের সুর বাঁধেন মিডফিল্ডের প্রাণভোমরা রদ্রি। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রক্ষণও সামলান সাবেক এই ব্যালন ডি’অরজয়ী। পেদ্রি ও দানি ওলমো হাফ স্পেসে জায়গা খুঁজে ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করেন।
মেসিকে কী বলছেন স্কালোনিরয়টার্স
তখন দুই ফুলব্যাক ওপরে উঠে উইং সচল রাখেন। লামিনে ইয়ামালসহ উইঙ্গার আর ফরোয়ার্ডরা ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করেন।
আক্রমণে গিয়ে বল হারালে স্পেন সঙ্গে সঙ্গে গেগেনপ্রেসিংয়ে চলে যায়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে চায়। বল পায়ে না থাকলেও তারা সমান কার্যকর—এবারের বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন।
আর্জেন্টিনার রণকৌশল
স্কালোনির আর্জেন্টিনা কোনো একটিমাত্র কৌশলে বাঁধা নয়। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে তারা কৌশল বদলায়। আক্রমণ গড়তে ছোট পাসের নিখুঁত সমন্বয় গড়ে তোলে, যা দিয়ে প্রতিপক্ষের তীব্র প্রেসিং ভেঙেও বেরিয়ে যেতে পারে তারা।
কখনো মিডফিল্ডে খেলোয়াড় বাড়িয়ে সুবিধা নেয়, কখনো মাঠের এক পাশে খেলোয়াড় জড়ো করে প্রতিপক্ষকে টেনে নিয়ে অন্য প্রান্তের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগায়। আর্জেন্টিনার বড় শক্তি হলো চাপের মধ্যেও অল্প জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা। খেলোয়াড়েরা নিয়মিত অবস্থান বদলান, যাতে প্রতিপক্ষের রক্ষণ বিভ্রান্ত হয়ে ভেঙে পড়ে।
বল দখলে না থাকলে দরকারে নিচে নেমে পুরো দল রক্ষণ সামলাতেও দ্বিধা করে না। তখন অবশ্য মেসি পূর্ণ ছাড় পান—বাকি ৯ জন সংঘবদ্ধভাবে রক্ষণে নামেন, কখনো নিচু ব্লক গড়ে, কখনো দ্রুত অবস্থানে ফিরে। মেসিকে রক্ষণে না খাটিয়ে আক্রমণের জন্য সতেজ রাখাটাই স্কালোনির কৌশল। বল পুনরুদ্ধারের পর দ্রুত আক্রমণে ওঠার জন্য তাঁকে মাঝমাঠের কাছে রাখা হয়।
আর্জেন্টিনা আক্রমণে বহুলাংশে মেসির ওপরই নির্ভরশীল। দল যখনই চাপে পড়েছে, তাকিয়ে থেকেছে মেসি-ম্যাজিকের দিকে, আর মেসিও প্রতিবার দলকে উদ্ধার করেছেন। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পাওয়া ১৯ গোলের ৮টিই মেসির, ১২ গোলে তাঁর সরাসরি অবদান।
স্কালোনির কৌশল কী আজ কাজে দেবেএএফপি
আরও বিস্ময়কর—আর্জেন্টিনার তৈরি করা ১১৩টি গোলের সুযোগের ৯৯টিতেই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। তবে এনজো ফার্নান্দেজ, লাওতারো মার্তিনেজ কিংবা রদ্রিগো দি পলদের অবদানও কম নয়—মেসির যোগ্য সারথি হয়ে তাঁরাও বিশ্বকাপে ভূমিকা রেখেছেন।
নিউইয়র্ক–নিউ জার্সির ফাইনালটি তাই হতে যাচ্ছে কৌশলগত বুদ্ধিমত্তায় ঠাসা দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। কৌশল এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শেষ কথা নয়। এমন ম্যাচে দরকার হয় একটা জাদুকরি মুহূর্তের। মেসি, ইয়ামাল বা অন্য কারও পায়ে তৈরি হওয়া তেমন এক মুহূর্তেই হয়তো লেখা হয়ে যাবে শিরোপার ভাগ্য।