গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসকে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। পরে তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
সিআইডি সূত্র জানায়, রোববার রাতে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫)-এর ৪(২) ধারায় দায়ের করা মামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের গোপীনাথ তরনী দাসের ছেলে হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসসহ অজ্ঞাতনামা আরো দুই থেকে তিন জনকে আসামি করা হয়। একই রাতে সিআইডির একটি বিশেষ দল পলাশবাড়ী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে আসে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সিআইডির অনুসন্ধানে হরিদাসের নামে পরিচালিত পাঁচটি ব্যাংক হিসাব ও চারটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাব বিশ্লেষণ করে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে মোট ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৪৫১ টাকা জমা এবং ৯ কোটি ৩৫ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৮ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও এসব লেনদেনের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করে তদন্ত সংস্থা।
সিআইডির দাবি, হরিদাস ও তার সহযোগীরা সংঘবদ্ধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জন করেন। পরে সেই অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে প্রকৃত উৎস ও মালিকানা গোপন করে বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যবসাবহির্ভূতভাবে তার ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে একজন ব্যক্তি ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে তার একাধিক হিসাবে ২ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন, যা প্রাথমিকভাবে হুন্ডির অর্থ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
সিআইডির দেওয়া তথ্যে আরো বলা হয়, ২০১০ সালে হরিদাস অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে দেশে ফিরে বিভিন্ন পরিচয়ে চলাফেরা করেন। ২০১৯ সালে ধর্ম পরিবর্তনের পর তিনি তৌহিদ ইসলাম নাম ব্যবহার করতেন এবং নিজেকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। সোমবার তাকে ঢাকার আদালতে হাজির করে সিআইডি রিমান্ড আবেদন করলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, এই সময়ে হুন্ডি চক্র, অর্থের উৎস, সহযোগীদের সম্পৃক্ততা এবং অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হবে।
পলাশবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের হরিদাস ২০১০ সালে ঢাকার উত্তরা এলাকায় এসে পুরাতন এসি মেরামত ও কেনাবেচার ব্যবসা শুরু করেন। বিয়ে করার জন্য ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে তাওহীদ ইসলাম নাম গ্রহণ করেন। এরপর তার শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় কিছু জমি কেনেন। পাশাপাশি নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে ২০২২ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যাব যৌথ অভিযানে রাজধানীর বনানী থেকে হরিদাসকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০২৪ সালে তিনি রামচন্দ্রপুর গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর গ্রামের শ্রীশ্রী কালীমন্দিরের পুরাতন অবকাঠামো পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের কাজ করার উদ্যোগ নেন। ২০২৫ সালের মে মাসে গ্রামের কালীমন্দিরের পুরাতন অবকাঠামো পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। মন্দিরের নাম পরিবর্তন করে শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ কালীমন্দির নামকরণ করেন। পরবর্তীতে সম্প্রতি মন্দির চত্বরে ৮১ ফুট রামমূর্তি নির্মাণকাজ শুরু করেন। এসব নির্মাণকাজ ও কাজের অর্থের উৎস নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন তিনি।
