সৌদিতে রমজান: বৈচিত্র্যময় লোকজ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য আখ্যান
শাওন হোসেন, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার: সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে রমজান মানেই কেবল উপাসনা নয়, বরং এটি বংশপরম্পরায় চলে আসা এক রঙিন উৎসব। নজদ থেকে হিজাজ, কিংবা জাজান থেকে কাতিফ—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব রীতি ও ঐতিহ্য পবিত্র এই মাসটিকে দেয় এক অনন্য মাত্রা।
নজদ: ‘পিতামাতার রাতের খাবার’ ও সামাজিক বন্ধন
নজদ অঞ্চলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘ইশা আল-ওয়ালিদায়েন’। এখানে পরিবারগুলো তাদের মৃত বা জীবিত পিতামাতা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণে আত্মীয়স্বজন এবং অভাবীদের জন্য ইফতার বা তারাবিহর পর ভোজের আয়োজন করে। এটি কেবল দান নয়, বরং সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যম।
হিজাজ: ‘সিদি শাহীন’ ও শিশুদের আনন্দধ্বনি
মদিনাসহ হিজাজ অঞ্চলে রমজানের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে একদল শিশু। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই রীতিতে শিশুরা ‘সিদি শাহীন’ গেয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মিষ্টি, বাদাম ও মুদ্রা সংগ্রহ করে। তাদের হাতে থাকা ছোট পাত্র বা ‘কুফ’ ভরে ওঠে প্রতিবেশীদের ভালোবাসায়।
পূর্ব প্রদেশ ও কাতিফ: গার্গী’আন ও নাসফার মেলা
সৌদির পূর্বাঞ্চল ও কাতিফে রমজানের মাঝামাঝি সময়ে পালিত হয় ‘গার্গী’আন’ বা ‘নাসফা’। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত শিশুরা ঘরে ঘরে গিয়ে উপহার সংগ্রহ করে। দাহরানের ‘ইথ্রা’ সেন্টারে এখন এই উৎসব আধুনিক ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার মাঝে আনন্দ বিলিয়ে দেয়।
জাজান ও হাইল: রন্ধনশৈলী ও আড্ডার মেজাজ
দক্ষিণের জাজানে মাটির চুলায় (মিফা) তৈরি ভুট্টা ও বাজরার রুটির সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এখানকার বিশেষ খাবার ‘মাফল্ট’ সেহরির ক্লান্তি দূর করতে জনপ্রিয়। অন্যদিকে, হাইল অঞ্চলে ঠান্ডা আবহাওয়ায় উপত্যকার নিচে খোলা আকাশের নিচে চলে ইফতারি। আগুনের ওপর চা-কফি তৈরি আর ভলিবল খেলা হাইলের রমজান যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন
কাতিফের ঐতিহ্য গবেষক ইসমাইল হেজলেসের মতে, এই উৎসবগুলো কেবল আচার নয়, বরং অতীত ও বর্তমানের যোগসূত্র। এখানে দান গ্রহণকারী শিশুর পরিচয় বড় নয়, বরং আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
