বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৩ (কেরানীগঞ্জ) আসন থেকে জয় পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং মাগুরা-২ (মহাম্মদপুর, শালিখা এবং মাগুরা সদর) আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বেয়াই।
জাতীয় নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির টিকিটে নির্বাচিত দুই হিন্দু সংসদ সদস্য— গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নিতাই রায় চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছেন।
এই দুই হিন্দু সংসদ সদস্য সমান নাগরিকত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ভরতার বদলে সমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
গত এক বছর দেড়েক ধরে ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত বারবার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যখন মন্দির ও হিন্দু মালিকানাধীন সম্পত্তিকে লক্ষ্য করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
তবে এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বলেন, সহিংসতা ধর্মীয়ভাবে সংঘটিত হয়নি। বরং এ ধরণের ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে, ধর্ম বিবেচনায় নয়।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন থেকে জয়ী হয়ে এই দুই হিন্দু আইনপ্রণেতা জোর দিয়ে বলেছেন, তাদের বিজয় একটি বার্তা দেয়। আর তা হল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমান নাগরিকত্ব রক্ষায় হিন্দু সংখ্যালঘুরা বিশ্বাস করতে পারে। বিএনপি চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে বৌদ্ধ প্রার্থীদের নিয়ে দুইটি আসনও জয় করেছে।
দ্য ওয়্যারকে ফোনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সিনিয়র বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, মাগুরা-২ আসনে হিন্দু ভোটাররা ‘ব্যাপকভাবে’ তাকে সমর্থন করেছেন এবং তার দল ধর্মীয় ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ভাগ হতে দেবে না।
তিনি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায় আমাদের জন্য ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছে। তারা দেশে সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। বিএনপি তাদের “নিঃশর্ত সমর্থন” সবসময় সম্মান করবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, হিন্দুরাও বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশে তাদের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার সব অধিকার রয়েছে এবং আমরা যে সব অধিকার নিশ্চিত করি তা তাদেরও রয়েছে।
ঢাকা-৩ (কেরানীগঞ্জ এবং রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকার) আসন থেকে জয়ী হয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দীর্ঘদিন ওই এলাকায় স্থানীয় সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিকত্বের ওপর আরও বেশি জোর দিয়েছেন। ১৯৯১ সালের খালেদা জিয়ার সরকারের সময় তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
দ্য ওয়্যারকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আমি হিন্দু হিসেবে জন্মেছি, তবে আমার পরিচয় বাংলাদেশি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাকে শুধু হিন্দুরাই নয়, সব ভোটারই নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি সকল মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২০২২ সালের আদমশুমারি ও আবাসন জরিপ অনুযায়ী, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী প্রায় ১৩.১ মিলিয়ন (১৩ লাখ ১০ হাজার) এবং এটি বাংলাদেশের ১৬৫.১৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার ৭.৯৫ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হিন্দুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না—এই প্রশ্নে ৭৪ বছর বয়সী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, উত্তরটি গনতন্ত্রের মধ্যেই রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া কেউ তার অধিকার ভোগ করতে পারে না। আমাদের প্রথমে গণতন্ত্র এবং আইন শৃঙ্খলা প্রয়োজন
তিনি বলেন, ‘আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করি। তারা নির্বাচনে অনেক অবদান রেখেছে। আমরা আমাদের স্বাধীনতাকে কখনও ভুলি না।’
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ও যাদের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি—তাদেরও আমরা কখনও ভুলি না।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়্যার
